ঢাকা   শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
আত্রাই বার্তা

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে শঙ্কা



আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে শঙ্কা

১২ এপ্রিল বিকালের ঘটনা। আধিপত্যের বিরোধের জেরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় এলেক্স ইমন নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর রেশ না কাটতেই ১৫ এপ্রিল গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় আসাদুল হক নামে আরেক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় উপহারের টোপ দিয়ে গত ২ মাসে অন্তত ১৩ জন নারীকে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষক রাশেদুল ইসলাম রাব্বিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রাজধানীর বাইরে শুক্রবার ভোরে রাঙামাটির কুতুবছড়ি আবাসিক এলাকায় খুন হয়েছেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নেতা ধর্মশিং চাকমা। তার দুই বোনকেও গুলি করা হয়। শনিবার দুপুরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরে দরবার শরিফে পীর আবদুর রহমান শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এসব খুন-ধর্ষণের ঘটনা ছাড়াও রাজধানীসহ সারা দেশে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এসব ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় জনমনে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে দেশে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে ১৪ শতাংশ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে যথাক্রমে ২৯৪, ২১৭ ও ২৩৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে হত্যা মামলা হয়েছে যথাক্রমে ২৮৭, ২৫০ ও ৩১৭টি।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতিতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। এভাবে ক্রমান্বয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকলে জনরোষের সৃষ্টি হবে। অর্থনীতি বা অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তাদের মতে, সরকারের অগ্রধিকারের তালিকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার কৌশল থাকতে হবে। না হলে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে সরকারকে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিভিন্ন অপরাধের ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের মনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে তারা থাকে শঙ্কায়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তিত অবস্থার পরের সময়টাকে দুই ভাগে দেখা যায়। একটি হচ্ছে-‘সিজনাল ভেরিয়েশন ইন ক্রাইম।’ অর্থাৎ সহিংস অপরাধের ক্ষেত্রে ঋতুগত তারতম্যের সঙ্গে অপরাধের একটা মাত্রাগত সম্পর্ক থাকে। সেটা মার্চ মাস থেকে শুরু করে আগস্ট-জুলাই পর্যন্ত চলে। এই সময়ে সহিংস অপরাধ বাড়ে। দ্বিতীয় ভাগটি হচ্ছে-আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তিকে কেন্দ্র করে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। কারণ এই দুটো জায়গা এখনো অস্থির অবস্থায় আছে। এখনো স্থিতিশীল অবস্থায় যাওয়া সম্ভব হয়নি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও দৃঢ়ভাবে কাজ করতে হবে উল্লেখ করে অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক বলেন, নতুন রাজনৈতিক সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঢেলে সাজাচ্ছে। ফলে হত্যাকাণ্ডসহ এই ধরনের অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে বেশি পরিমাণ মনোনিবেশ করতে পারছে না বলে ধারণা করছি। অপরাধীরা এই সুযোগটাই নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরও দৃঢ়ভাবে নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে যদি কাজ করতে পারে, তাহলে মানুষের মধ্যে একটা বিশ্বাসের জায়গা তৈরি হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন অপরাধের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি হয়। অনেক গৃহিণী বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত দুশ্চিন্তায় থাকেন। নেতিবাচক খবরের কারণে অনেকের মনস্তাত্ত্বিক উদাসীনতা তৈরি হয়।

যা ঘটছে ঢাকার বাইরে : খুলনায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনা। গত দেড় বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জেলায় খুন, গুলিবর্ষণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সবচেয়ে বেশি ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও খুলনা জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসেই জেলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন অন্তত ২১ জন। আহত হয়েছেন ৫০ জনের বেশি। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তবে অপরাধ প্রবণতা ঠেকাতে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন তারা।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় চাঁদার টাকা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে মামুনুর রশিদ জুয়েল (৪৮) নামে এক মুদি দোকানিকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। শুক্রবার সকালে উপজেলার কাউন্সিল বাজারে এ ঘটনা ঘটে। মানিকগঞ্জে নিখোঁজ ৮ বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে স্থানীয়রা দুই ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করে। বৃহস্পতিবার বিকালে সদর উপজেলায় হাটিপাড়া ইউনিয়নের বনপারিল (কান্দুরপার ব্রিজ) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই জড়িত সন্দেহে স্থানীয়রা ৩ জনকে আটক করে মারধর করে। এতে অটোরিকশাচালক পান্নু মিয়া (৩৫) এবং তার ভাই ফজলু (২৮) নিহত হন।

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে খুন, চুরি, মাদক, জুয়া উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ৯ মার্চ উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের মারুয়াকালি গ্রামে ৪ বছরের শিশুকন্যা মরিয়মকে হত্যা করে পাশের বাড়ির পরিত্যক্ত একটি রান্নাঘরের চুলার ভেতরে লাশ লুকিয়ে রাখা হয়। ময়মনসিংহের গৌরীপুরেও খুন, কৃষকের মোটর চুরি, গরু চুরি, বিদ্যুৎ বিভাগের ট্রান্সফরমার চুরি, অটোরিকশা-মোটরসাইকেল চুরি-ছিনতাই বেড়েছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ১৫ দিনের ব্যবধানে তিনটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সিলেটের বিশ্বনাথে বেড়েছে চুরি, ছিনতাইসহ খুনের ঘটনা। গত এক মাসে প্রায় ৩০টি চুরি, একটি ছিনতাই, একটি খুন ও একটি গুপ্তহত্যার ঘটনা ঘটেছে। সিলেটের ওসমানীনগরে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত উপজেলার বুরুঙ্গা ইউনিয়নে ১১ দিনের ব্যবধানে ইউপি সদস্যসহ দুই ব্যক্তি এবং উছমানপুর ইউনিয়নে এক যুবকসহ ৩ ব্যক্তিকে খুন করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। খুন, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সীমান্তে চোরাচালান ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত আড়াই মাসে উপজেলায় দুটি হত্যাকাণ্ড, তিনটি ধর্ষণ, একটি দুর্ধর্ষ ডাকাতি ও অসংখ্য চুরির ঘটনা ঘটেছে।

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলায়ও অপরাধ বেড়ে গেছে। মার্চ মাসে উপজেলা পরিষদের মাসিক আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক কমিটির মতবিনিময় সভায় মাদক ও চুরি মারাত্মক আকারে বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনপ্রতিনিধিরা।

চট্টগ্রামের পটিয়ায় ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি এখন নৈমিত্তিক ঘটনা। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ দিতে গিয়ে সেবার বদলে আইনের অপব্যাখ্যা আর আশ্বাস নিয়ে ফিরে আসছেন।

পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, জনমনে একটা অস্বস্তি ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই অস্বস্তি দূর করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অত্যন্ত তৎপর হতে হবে। ছিনতাই, ডাকাতি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, হত্যা-এগুলোকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। সন্ত্রাসীদের কাছে যেসব অস্ত্র আছে সেগুলো উদ্ধার করতে হবে। দরকার হলে সমন্বিত অর্ভিযান চালাতে হবে। মানুষের জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে বড় আর কিছু নেই।

তিনি আরও বলেন, মানুষের জীবনের নিরাপত্তাটা সবচেয়ে বড় পাওয়া। মানুষ যেন নির্ভয়ে চলাচল করতে পারে তার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। তারা যেন স্বস্তি পায় এবং একটা শান্ত-সুস্থ পরিবেশ বজায় থাকে সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে।

আত্রাই বার্তা

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬


আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে শঙ্কা

প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

১২ এপ্রিল বিকালের ঘটনা। আধিপত্যের বিরোধের জেরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় এলেক্স ইমন নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর রেশ না কাটতেই ১৫ এপ্রিল গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় আসাদুল হক নামে আরেক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় উপহারের টোপ দিয়ে গত ২ মাসে অন্তত ১৩ জন নারীকে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষক রাশেদুল ইসলাম রাব্বিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রাজধানীর বাইরে শুক্রবার ভোরে রাঙামাটির কুতুবছড়ি আবাসিক এলাকায় খুন হয়েছেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নেতা ধর্মশিং চাকমা। তার দুই বোনকেও গুলি করা হয়। শনিবার দুপুরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরে দরবার শরিফে পীর আবদুর রহমান শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এসব খুন-ধর্ষণের ঘটনা ছাড়াও রাজধানীসহ সারা দেশে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এসব ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় জনমনে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে দেশে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে ১৪ শতাংশ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে যথাক্রমে ২৯৪, ২১৭ ও ২৩৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে হত্যা মামলা হয়েছে যথাক্রমে ২৮৭, ২৫০ ও ৩১৭টি।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতিতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। এভাবে ক্রমান্বয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকলে জনরোষের সৃষ্টি হবে। অর্থনীতি বা অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তাদের মতে, সরকারের অগ্রধিকারের তালিকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার কৌশল থাকতে হবে। না হলে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে সরকারকে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিভিন্ন অপরাধের ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের মনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে তারা থাকে শঙ্কায়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তিত অবস্থার পরের সময়টাকে দুই ভাগে দেখা যায়। একটি হচ্ছে-‘সিজনাল ভেরিয়েশন ইন ক্রাইম।’ অর্থাৎ সহিংস অপরাধের ক্ষেত্রে ঋতুগত তারতম্যের সঙ্গে অপরাধের একটা মাত্রাগত সম্পর্ক থাকে। সেটা মার্চ মাস থেকে শুরু করে আগস্ট-জুলাই পর্যন্ত চলে। এই সময়ে সহিংস অপরাধ বাড়ে। দ্বিতীয় ভাগটি হচ্ছে-আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তিকে কেন্দ্র করে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। কারণ এই দুটো জায়গা এখনো অস্থির অবস্থায় আছে। এখনো স্থিতিশীল অবস্থায় যাওয়া সম্ভব হয়নি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও দৃঢ়ভাবে কাজ করতে হবে উল্লেখ করে অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক বলেন, নতুন রাজনৈতিক সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঢেলে সাজাচ্ছে। ফলে হত্যাকাণ্ডসহ এই ধরনের অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে বেশি পরিমাণ মনোনিবেশ করতে পারছে না বলে ধারণা করছি। অপরাধীরা এই সুযোগটাই নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরও দৃঢ়ভাবে নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে যদি কাজ করতে পারে, তাহলে মানুষের মধ্যে একটা বিশ্বাসের জায়গা তৈরি হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন অপরাধের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি হয়। অনেক গৃহিণী বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত দুশ্চিন্তায় থাকেন। নেতিবাচক খবরের কারণে অনেকের মনস্তাত্ত্বিক উদাসীনতা তৈরি হয়।

যা ঘটছে ঢাকার বাইরে : খুলনায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনা। গত দেড় বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জেলায় খুন, গুলিবর্ষণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সবচেয়ে বেশি ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও খুলনা জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসেই জেলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন অন্তত ২১ জন। আহত হয়েছেন ৫০ জনের বেশি। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তবে অপরাধ প্রবণতা ঠেকাতে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন তারা।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় চাঁদার টাকা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে মামুনুর রশিদ জুয়েল (৪৮) নামে এক মুদি দোকানিকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। শুক্রবার সকালে উপজেলার কাউন্সিল বাজারে এ ঘটনা ঘটে। মানিকগঞ্জে নিখোঁজ ৮ বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে স্থানীয়রা দুই ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করে। বৃহস্পতিবার বিকালে সদর উপজেলায় হাটিপাড়া ইউনিয়নের বনপারিল (কান্দুরপার ব্রিজ) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই জড়িত সন্দেহে স্থানীয়রা ৩ জনকে আটক করে মারধর করে। এতে অটোরিকশাচালক পান্নু মিয়া (৩৫) এবং তার ভাই ফজলু (২৮) নিহত হন।

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে খুন, চুরি, মাদক, জুয়া উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ৯ মার্চ উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের মারুয়াকালি গ্রামে ৪ বছরের শিশুকন্যা মরিয়মকে হত্যা করে পাশের বাড়ির পরিত্যক্ত একটি রান্নাঘরের চুলার ভেতরে লাশ লুকিয়ে রাখা হয়। ময়মনসিংহের গৌরীপুরেও খুন, কৃষকের মোটর চুরি, গরু চুরি, বিদ্যুৎ বিভাগের ট্রান্সফরমার চুরি, অটোরিকশা-মোটরসাইকেল চুরি-ছিনতাই বেড়েছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ১৫ দিনের ব্যবধানে তিনটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সিলেটের বিশ্বনাথে বেড়েছে চুরি, ছিনতাইসহ খুনের ঘটনা। গত এক মাসে প্রায় ৩০টি চুরি, একটি ছিনতাই, একটি খুন ও একটি গুপ্তহত্যার ঘটনা ঘটেছে। সিলেটের ওসমানীনগরে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত উপজেলার বুরুঙ্গা ইউনিয়নে ১১ দিনের ব্যবধানে ইউপি সদস্যসহ দুই ব্যক্তি এবং উছমানপুর ইউনিয়নে এক যুবকসহ ৩ ব্যক্তিকে খুন করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। খুন, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সীমান্তে চোরাচালান ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত আড়াই মাসে উপজেলায় দুটি হত্যাকাণ্ড, তিনটি ধর্ষণ, একটি দুর্ধর্ষ ডাকাতি ও অসংখ্য চুরির ঘটনা ঘটেছে।

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলায়ও অপরাধ বেড়ে গেছে। মার্চ মাসে উপজেলা পরিষদের মাসিক আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক কমিটির মতবিনিময় সভায় মাদক ও চুরি মারাত্মক আকারে বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনপ্রতিনিধিরা।

চট্টগ্রামের পটিয়ায় ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি এখন নৈমিত্তিক ঘটনা। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ দিতে গিয়ে সেবার বদলে আইনের অপব্যাখ্যা আর আশ্বাস নিয়ে ফিরে আসছেন।

পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, জনমনে একটা অস্বস্তি ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই অস্বস্তি দূর করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অত্যন্ত তৎপর হতে হবে। ছিনতাই, ডাকাতি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, হত্যা-এগুলোকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। সন্ত্রাসীদের কাছে যেসব অস্ত্র আছে সেগুলো উদ্ধার করতে হবে। দরকার হলে সমন্বিত অর্ভিযান চালাতে হবে। মানুষের জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে বড় আর কিছু নেই।

তিনি আরও বলেন, মানুষের জীবনের নিরাপত্তাটা সবচেয়ে বড় পাওয়া। মানুষ যেন নির্ভয়ে চলাচল করতে পারে তার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। তারা যেন স্বস্তি পায় এবং একটা শান্ত-সুস্থ পরিবেশ বজায় থাকে সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে।


আত্রাই বার্তা

সম্পাদক : মোঃ মোজাফফর হোসেন, বার্তা সম্পাদক শেখ নেছারুল ইসলাম
কপিরাইট © ২০২৬ আত্রাই বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত