ডিজেলের দাম বাড়ল ২০ টাকা, জমি চাষের ভাড়া বাড়লো ৩০০–৪০০ টাকা কৃষকদের পাশে দাঁড়াবে কে?
আলু ও ভুট্টা চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকেরা। কিন্তু ফসল ফলানোর আগেই জমি চাষের বাড়তি খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা। দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষের ভাড়া বিঘাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা।
কৃষকদের অভিযোগ, ট্রাক্টর মালিকেরা একজোট হয়ে মাইকিংয়ের মাধ্যমে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করেছেন। এতে কৃষকদের দরদাম করার সুযোগ কমে গেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়লে জমি চাষের ভাড়া ৩০০–৪০০ টাকা বাড়ানোর যৌক্তিকতা কতটুকু?
একটু হিসাব করে দেখা যাক
কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৫০ শতকের এক বিঘা জমি একবার চাষ করতে খরচ হতো ৬০০–৭০০ টাকা। এ বছর সেই জমি চাষ করতে দিতে হচ্ছে ৯০০–১,০০০ টাকা।
অর্থাৎ, বিঘাপ্রতি খরচ বেড়েছে ৩০০–৪০০ টাকা।
কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমি চাষ করতে প্রায় ৫–৭ লিটার ডিজেল লাগে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়লে অতিরিক্ত খরচ হয় ১০০–১৪০ টাকা।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে, ডিজেলের পেছনে বাড়তি ১০০–১৪০ টাকা খরচ হলে জমি চাষের ভাড়া ৩০০–৪০০ টাকা বাড়ানোর কারণ কী?
অবশ্য ট্রাক্টরের মেরামত, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচও রয়েছে। তাই ভাড়া বাড়ানোর পেছনে এসব খরচের হিসাবও জানা প্রয়োজন।
১০ বিঘা জমি চাষে বাড়তি খরচ কত?
ধরা যাক, একজন কৃষকের ১০ বিঘা জমি রয়েছে।
আগের তুলনায় বিঘাপ্রতি ৩০০ টাকা বেশি হলে একবার চাষ করাতেই তাঁকে অতিরিক্ত দিতে হবে ৩ হাজার টাকা।
একই জমিতে তিনবার চাষ করালে বাড়তি খরচ দাঁড়াবে ৯ হাজার টাকা।
ভাড়া বিঘাপ্রতি ৪০০ টাকা বাড়লে ১০ বিঘা জমিতে তিনবার চাষ করাতে অতিরিক্ত খরচ হতে পারে ১২ হাজার টাকা।
এর সঙ্গে রয়েছে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের খরচ। সব মিলিয়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
কিন্তু ফসল বিক্রি করে সেই টাকা উঠবে কি না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?
কৃষকের অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া হচ্ছে না তো?
ট্রাক্টর মালিকদেরও জ্বালানি, শ্রমিক ও যন্ত্রপাতি মেরামতের খরচ রয়েছে। তাঁদেরও লাভ করে ব্যবসা করার অধিকার আছে।
কিন্তু সেই অজুহাতে যদি অস্বাভাবিক হারে ভাড়া বাড়ানো হয়, তাহলে কৃষকেরা যাবেন কোথায়?
কৃষককে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমি চাষ করাতেই হবে। তা না হলে আলু-ভুট্টা চাষে সমস্যা হতে পারে। এই প্রয়োজনের কারণে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকা দিচ্ছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
ট্রাক্টর মালিকেরা একজোট হয়ে ভাড়া নির্ধারণ করেছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তার সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ, সবাই মিলে ভাড়া বাড়ালে কৃষকদের কম দামে সেবা পাওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে।
প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি
খানসামা উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কাছে দাবি, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হোক।
গত বছরের ভাড়া ও বর্তমান ভাড়ার হিসাব যাচাই করা হোক। ডিজেলের দাম ও অন্যান্য খরচ বিবেচনা করে ভাড়া কতটা বাড়ানো যৌক্তিক, তা খতিয়ে দেখা হোক।
কৃষক ও ট্রাক্টর মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি ন্যায্য সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হোক। যোগসাজশের মাধ্যমে অযৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
কৃষক শুধু ফসল ফলান না, তিনি দেশের মানুষের খাবারের জোগান দেন। অথচ ফসল উৎপাদনের শুরুতেই যদি তাঁকে বাড়তি খরচের চাপে পড়তে হয়, তাহলে কৃষিকাজ করে লাভবান হবেন কীভাবে?
আমরা ট্রাক্টর মালিকদের বিরুদ্ধে নই। আমরা চাই, কৃষক ও ট্রাক্টর মালিক—দুই পক্ষই ন্যায্য সুবিধা পাক।
কিন্তু ডিজেলের দাম বাড়ার তুলনায় জমি চাষের ভাড়া এত বেশি বাড়ানোর কারণ কী?
কৃষকদের এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর কি কেউ নেই?