ঢাকা   মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
আত্রাই বার্তা

খানসামায় ৫০ মৌজার গেজেট প্রকাশ, তবু অনলাইনে মিলছে না ভূমির তথ্য



খানসামায় ৫০ মৌজার গেজেট প্রকাশ, তবু অনলাইনে মিলছে না ভূমির তথ্য
সহকারী সেটেলমেন্ট অফিস এর কার্যালয়, খানসামা, দিনাজপুর। ছবি: আত্রাই বার্তা

সেটেলমেন্ট অফিসের কম্পিউটারসহ যন্ত্রপাতি বিকল, ভোগান্তিতে জমির মালিকরা | ডিজিটাল সেবা চালুর দাবি

ডিজিটাল সেবার যুগে ঘরে বসে ভূমির খতিয়ান, পরচা ও জরিপ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকার কথা। অথচ দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় জমির প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংগ্রহ করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবাগ্রহীতারা। উপজেলার ৫৭টি মৌজার মধ্যে ৫০টির গেজেট প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট তথ্য অনলাইনে সহজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে জমির রেকর্ড সংগ্রহে বারবার উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে ছুটতে হচ্ছে তাঁদের। এতে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, বাড়ছে যাতায়াত ব্যয় এবং দীর্ঘ হচ্ছে সেবা পাওয়ার অপেক্ষা।

সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, একবার অফিসে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পেলে কিংবা কাজ শেষ না হলে আবারও আসতে হয়। দূরবর্তী গ্রাম থেকে আসা কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও নিম্নআয়ের পরিবারের সদস্যদের জন্য এই ভোগান্তি আরও বেশি। তাঁদের প্রশ্ন—সরকারি দপ্তরে ডিজিটাল সেবার ব্যবস্থা থাকার পরও কেন প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে সরাসরি অফিসে যেতে হবে?

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে খানসামা উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, অফিসের কম্পিউটারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বিকল অবস্থায় রয়েছে। ফলে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার পরিবর্তে পুরোনো পদ্ধতিতে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। জমির খতিয়ান, পরচা, নকশা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য সেবাগ্রহীতাদের সরাসরি অফিসে এসে সংশ্লিষ্ট শাখায় যোগাযোগ করতে হচ্ছে।

উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, খানসামার ৫৭টি মৌজার মধ্যে ৫০টির গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। আরও ছয়টি মৌজার গেজেট প্রকাশের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বাকি একটি মৌজার গেজেট এখনো প্রকাশিত হয়নি। তবে গেজেট প্রকাশিত মৌজাগুলোর তথ্যও অনলাইনে সহজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের। কোন মৌজার রেকর্ড ডিজিটাল ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, কোনটি হয়নি এবং অনলাইনে তথ্য না পাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ কী—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি ওয়েবসাইটে সেবার ঘোষণা, বাস্তবে ভোগান্তি

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সরকারি অনলাইন পোর্টালে খতিয়ানের তথ্য অনুসন্ধান, রেকর্ড প্রদর্শন, মানচিত্র দেখা এবং ই-সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। পোর্টালটিতে আরও বলা হয়েছে, চলমান জরিপের খতিয়ান এবং জরিপ সম্পন্ন হয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা রেকর্ডের জন্য পৃথক অনলাইন ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে রেকর্ডের ধরন অনুযায়ী সঠিক প্ল্যাটফর্মে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। (সূত্র: ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর, settlement.gov.bd)

অন্যদিকে, দিনাজপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের সরকারি ওয়েবসাইটে ২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত বার্তায় অফিসে না এসে ঘরে বসে পরচা সংগ্রহের জন্য অনলাইন সেবা ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু খানসামার বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় রেকর্ড অনলাইনে না পাওয়ায় তাঁরা ঘোষিত সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছেন না।

এ ছাড়া ব্যবহারকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দিনাজপুর জেলার ১৩টি উপজেলার তালিকায় ১২টির নাম রয়েছে। সেখানে ০৫ নম্বরে বীরগঞ্জ ও ০৭ নম্বরে চিরিরবন্দর উপজেলার নাম থাকলেও ০৬ নম্বরে খানসামা উপজেলার নাম নেই। ওয়েবসাইটের তালিকায় এই অনুপস্থিতি তথ্য হালনাগাদ বা প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতির ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

একটি খতিয়ানের জন্য বারবার অফিসে

খানসামা উপজেলার হাসিমপুর মৌজার বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম জানান, জমিসংক্রান্ত সাধারণ তথ্যের জন্যও তাঁকে অফিসে এসে একাধিকবার যোগাযোগ করতে হয়। এক দিনে কাজ শেষ না হলে আবার আসতে হয়। এতে কর্মজীবী মানুষকে দিনের কাজ বাদ দিতে হচ্ছে।

তাঁর অভিজ্ঞতা স্থানীয় ভূমিসেবা ব্যবস্থার একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—সাধারণ মানুষকে যে তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজে দেওয়ার কথা, তা পেতে কেন তাঁদের বারবার দপ্তরে যেতে হবে?

বিশেষ করে কৃষিপ্রধান এই উপজেলার প্রত্যন্ত ইউনিয়ন ও গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দাদের অনেকের জন্য অফিসে যাওয়া মানে যাতায়াত খরচের পাশাপাশি একটি কর্মদিবস হারানো। কৃষককে জমির কাজ ফেলে আসতে হয়, শ্রমজীবী মানুষকে দৈনিক আয় হারানোর ঝুঁকি নিতে হয়, আর দূর থেকে আসা সেবাগ্রহীতাকে পুনরায় যাতায়াতের খরচ বহন করতে হয়। সরকারি সেবার ডিজিটাল সুবিধা কার্যকর না হলে এই বাড়তি চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিককেই বহন করতে হচ্ছে।

যন্ত্রপাতি বিকল—রক্ষণাবেক্ষণ ও জবাবদিহি কোথায়?

একটি সরকারি দপ্তরে কম্পিউটার ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম বিকল থাকলে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু যন্ত্রপাতি কত দিন ধরে বিকল, সেগুলো সচল করার জন্য কোনো লিখিত চাহিদা পাঠানো হয়েছে কি না, মেরামত বা প্রতিস্থাপনের বরাদ্দ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন।

যন্ত্রপাতি বিকল থাকার বিষয়টি যদি অনলাইন সেবা ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ হয়, তাহলে দ্রুত মেরামত, বিকল্প ব্যবস্থায় সেবা চালু এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অনলাইনে তথ্য না থাকার পেছনে জনবলসংকট, তথ্য এন্ট্রি না হওয়া, সার্ভার বা সফটওয়্যার সমস্যা কিংবা রেকর্ড ডিজিটাইজেশনের অসম্পূর্ণতা—কোনটি দায়ী, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে শুধু স্থানীয় অফিসের ওপর দায় চাপিয়ে থেমে থাকলে চলবে না। সংশ্লিষ্ট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরেরও বিষয়টি পর্যালোচনা করা দরকার। সমস্যা যদি কেন্দ্রীয় তথ্যব্যবস্থা বা রেকর্ড হালনাগাদের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নাও হতে পারে।

কর্তৃপক্ষের কাছে যেসব প্রশ্ন

খানসামার ভূমিসেবা নিয়ে জনভোগান্তি কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

প্রথমত, ৫০টি গেজেট প্রকাশিত মৌজার মধ্যে কতটির চূড়ান্ত রেকর্ড অনলাইনে পাওয়া যায় এবং কতটির তথ্য এখনো ডিজিটাল ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি?

দ্বিতীয়ত, উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের বিকল কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সচল করার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? মেরামত বা প্রতিস্থাপনের নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে কি?

তৃতীয়ত, সরকারি ওয়েবসাইটে খানসামা উপজেলার নাম ও প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদ না থাকলে তার কারণ কী? তথ্য হালনাগাদের দায়িত্ব কোন দপ্তরের?

চতুর্থত, অনলাইনে তথ্য পাওয়া না যাওয়া পর্যন্ত সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কমাতে বিকল্প সেবা, তথ্যসহায়তা ডেস্ক কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হবে কি?

পঞ্চমত, বাকি সাতটি মৌজার গেজেট-সংক্রান্ত কাজের বর্তমান অগ্রগতি কী এবং প্রস্তাব পাঠানো ছয়টি মৌজার বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে জানানো হলে প্রকৃত সমস্যার কারণ নির্ধারণ সহজ হবে। একই সঙ্গে কোন দপ্তর কী দায়িত্ব পালন করবে, সেটিও স্পষ্ট হবে।

দ্রুত সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটে নাগরিক সেবা, সিটিজেন চার্টার এবং অনলাইনে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমি তথ্য বাতায়নেও ভূমিসেবা-সংক্রান্ত সহায়তার জন্য ১৬১২২ নম্বর দেওয়া হয়েছে। (সূত্র: dlrs.gov.bd ও land.gov.bd)

এ অবস্থায় খানসামা উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের সেবাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। এর আওতায় বিকল যন্ত্রপাতি সচল করা, মৌজাভিত্তিক রেকর্ডের ডিজিটাল অবস্থা যাচাই, অনলাইনে অনুপস্থিত তথ্য হালনাগাদ, ওয়েবসাইটের উপজেলা তালিকা সংশোধন এবং সেবা প্রদানের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত, কোন কাজ কত দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে তা নির্ধারণ করে নাগরিকদের জানানো। পাশাপাশি অনলাইনে তথ্য পাওয়া না গেলে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, কী কী কাগজপত্র লাগবে এবং কত দিনে সেবা দেওয়া হবে—এসব তথ্য অফিসের নোটিশ বোর্ড ও অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

জনগণের করের অর্থে পরিচালিত সরকারি দপ্তরের সেবা মানুষের কাছে সহজলভ্য হওয়াই প্রত্যাশিত। গেজেট প্রকাশ, ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং নাগরিকের হাতে সেই তথ্য পৌঁছে দেওয়া—এই তিনটি পর্যায়ের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে ডিজিটাল সেবার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।

খানসামার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট উপজেলা, জেলা ও অধিদপ্তর পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করবেন। অনলাইনে ভূমির তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা, বিকল যন্ত্রপাতি সচল করা এবং সেবাগ্রহীতাদের অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শুধু সমস্যার কথা জানা নয়, সমাধানের অগ্রগতি প্রকাশ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিবেদকের নোট: প্রকাশের আগে খানসামার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা, দিনাজপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে অনলাইনে তথ্য না থাকার কারণ, বিকল যন্ত্রপাতি সচল করার পরিকল্পনা এবং কাজ শেষ করার সম্ভাব্য সময়সীমা তাঁদের কাছে জানতে চাইলে প্রতিবেদনটি আরও তথ্যসমৃদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক হবে।

আত্রাই বার্তা

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬


খানসামায় ৫০ মৌজার গেজেট প্রকাশ, তবু অনলাইনে মিলছে না ভূমির তথ্য

প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সেটেলমেন্ট অফিসের কম্পিউটারসহ যন্ত্রপাতি বিকল, ভোগান্তিতে জমির মালিকরা | ডিজিটাল সেবা চালুর দাবি

ডিজিটাল সেবার যুগে ঘরে বসে ভূমির খতিয়ান, পরচা ও জরিপ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকার কথা। অথচ দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় জমির প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংগ্রহ করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবাগ্রহীতারা। উপজেলার ৫৭টি মৌজার মধ্যে ৫০টির গেজেট প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট তথ্য অনলাইনে সহজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে জমির রেকর্ড সংগ্রহে বারবার উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে ছুটতে হচ্ছে তাঁদের। এতে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, বাড়ছে যাতায়াত ব্যয় এবং দীর্ঘ হচ্ছে সেবা পাওয়ার অপেক্ষা।


সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, একবার অফিসে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পেলে কিংবা কাজ শেষ না হলে আবারও আসতে হয়। দূরবর্তী গ্রাম থেকে আসা কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও নিম্নআয়ের পরিবারের সদস্যদের জন্য এই ভোগান্তি আরও বেশি। তাঁদের প্রশ্ন—সরকারি দপ্তরে ডিজিটাল সেবার ব্যবস্থা থাকার পরও কেন প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে সরাসরি অফিসে যেতে হবে?


মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে খানসামা উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, অফিসের কম্পিউটারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বিকল অবস্থায় রয়েছে। ফলে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার পরিবর্তে পুরোনো পদ্ধতিতে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। জমির খতিয়ান, পরচা, নকশা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য সেবাগ্রহীতাদের সরাসরি অফিসে এসে সংশ্লিষ্ট শাখায় যোগাযোগ করতে হচ্ছে।


উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, খানসামার ৫৭টি মৌজার মধ্যে ৫০টির গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। আরও ছয়টি মৌজার গেজেট প্রকাশের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বাকি একটি মৌজার গেজেট এখনো প্রকাশিত হয়নি। তবে গেজেট প্রকাশিত মৌজাগুলোর তথ্যও অনলাইনে সহজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের। কোন মৌজার রেকর্ড ডিজিটাল ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, কোনটি হয়নি এবং অনলাইনে তথ্য না পাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ কী—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


সরকারি ওয়েবসাইটে সেবার ঘোষণা, বাস্তবে ভোগান্তি


ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সরকারি অনলাইন পোর্টালে খতিয়ানের তথ্য অনুসন্ধান, রেকর্ড প্রদর্শন, মানচিত্র দেখা এবং ই-সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। পোর্টালটিতে আরও বলা হয়েছে, চলমান জরিপের খতিয়ান এবং জরিপ সম্পন্ন হয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা রেকর্ডের জন্য পৃথক অনলাইন ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে রেকর্ডের ধরন অনুযায়ী সঠিক প্ল্যাটফর্মে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। (সূত্র: ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর, settlement.gov.bd)


অন্যদিকে, দিনাজপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের সরকারি ওয়েবসাইটে ২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত বার্তায় অফিসে না এসে ঘরে বসে পরচা সংগ্রহের জন্য অনলাইন সেবা ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু খানসামার বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় রেকর্ড অনলাইনে না পাওয়ায় তাঁরা ঘোষিত সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছেন না।


এ ছাড়া ব্যবহারকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দিনাজপুর জেলার ১৩টি উপজেলার তালিকায় ১২টির নাম রয়েছে। সেখানে ০৫ নম্বরে বীরগঞ্জ ও ০৭ নম্বরে চিরিরবন্দর উপজেলার নাম থাকলেও ০৬ নম্বরে খানসামা উপজেলার নাম নেই। ওয়েবসাইটের তালিকায় এই অনুপস্থিতি তথ্য হালনাগাদ বা প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতির ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।


একটি খতিয়ানের জন্য বারবার অফিসে


খানসামা উপজেলার হাসিমপুর মৌজার বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম জানান, জমিসংক্রান্ত সাধারণ তথ্যের জন্যও তাঁকে অফিসে এসে একাধিকবার যোগাযোগ করতে হয়। এক দিনে কাজ শেষ না হলে আবার আসতে হয়। এতে কর্মজীবী মানুষকে দিনের কাজ বাদ দিতে হচ্ছে।


তাঁর অভিজ্ঞতা স্থানীয় ভূমিসেবা ব্যবস্থার একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—সাধারণ মানুষকে যে তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজে দেওয়ার কথা, তা পেতে কেন তাঁদের বারবার দপ্তরে যেতে হবে?


বিশেষ করে কৃষিপ্রধান এই উপজেলার প্রত্যন্ত ইউনিয়ন ও গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দাদের অনেকের জন্য অফিসে যাওয়া মানে যাতায়াত খরচের পাশাপাশি একটি কর্মদিবস হারানো। কৃষককে জমির কাজ ফেলে আসতে হয়, শ্রমজীবী মানুষকে দৈনিক আয় হারানোর ঝুঁকি নিতে হয়, আর দূর থেকে আসা সেবাগ্রহীতাকে পুনরায় যাতায়াতের খরচ বহন করতে হয়। সরকারি সেবার ডিজিটাল সুবিধা কার্যকর না হলে এই বাড়তি চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিককেই বহন করতে হচ্ছে।


যন্ত্রপাতি বিকল—রক্ষণাবেক্ষণ ও জবাবদিহি কোথায়?


একটি সরকারি দপ্তরে কম্পিউটার ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম বিকল থাকলে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু যন্ত্রপাতি কত দিন ধরে বিকল, সেগুলো সচল করার জন্য কোনো লিখিত চাহিদা পাঠানো হয়েছে কি না, মেরামত বা প্রতিস্থাপনের বরাদ্দ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন।


যন্ত্রপাতি বিকল থাকার বিষয়টি যদি অনলাইন সেবা ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ হয়, তাহলে দ্রুত মেরামত, বিকল্প ব্যবস্থায় সেবা চালু এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অনলাইনে তথ্য না থাকার পেছনে জনবলসংকট, তথ্য এন্ট্রি না হওয়া, সার্ভার বা সফটওয়্যার সমস্যা কিংবা রেকর্ড ডিজিটাইজেশনের অসম্পূর্ণতা—কোনটি দায়ী, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।


এ ক্ষেত্রে শুধু স্থানীয় অফিসের ওপর দায় চাপিয়ে থেমে থাকলে চলবে না। সংশ্লিষ্ট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরেরও বিষয়টি পর্যালোচনা করা দরকার। সমস্যা যদি কেন্দ্রীয় তথ্যব্যবস্থা বা রেকর্ড হালনাগাদের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নাও হতে পারে।


কর্তৃপক্ষের কাছে যেসব প্রশ্ন


খানসামার ভূমিসেবা নিয়ে জনভোগান্তি কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।


প্রথমত, ৫০টি গেজেট প্রকাশিত মৌজার মধ্যে কতটির চূড়ান্ত রেকর্ড অনলাইনে পাওয়া যায় এবং কতটির তথ্য এখনো ডিজিটাল ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি?


দ্বিতীয়ত, উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের বিকল কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সচল করার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? মেরামত বা প্রতিস্থাপনের নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে কি?


তৃতীয়ত, সরকারি ওয়েবসাইটে খানসামা উপজেলার নাম ও প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদ না থাকলে তার কারণ কী? তথ্য হালনাগাদের দায়িত্ব কোন দপ্তরের?


চতুর্থত, অনলাইনে তথ্য পাওয়া না যাওয়া পর্যন্ত সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কমাতে বিকল্প সেবা, তথ্যসহায়তা ডেস্ক কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হবে কি?


পঞ্চমত, বাকি সাতটি মৌজার গেজেট-সংক্রান্ত কাজের বর্তমান অগ্রগতি কী এবং প্রস্তাব পাঠানো ছয়টি মৌজার বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী?


এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে জানানো হলে প্রকৃত সমস্যার কারণ নির্ধারণ সহজ হবে। একই সঙ্গে কোন দপ্তর কী দায়িত্ব পালন করবে, সেটিও স্পষ্ট হবে।


দ্রুত সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ


ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটে নাগরিক সেবা, সিটিজেন চার্টার এবং অনলাইনে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমি তথ্য বাতায়নেও ভূমিসেবা-সংক্রান্ত সহায়তার জন্য ১৬১২২ নম্বর দেওয়া হয়েছে। (সূত্র: dlrs.gov.bd ও land.gov.bd)


এ অবস্থায় খানসামা উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের সেবাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। এর আওতায় বিকল যন্ত্রপাতি সচল করা, মৌজাভিত্তিক রেকর্ডের ডিজিটাল অবস্থা যাচাই, অনলাইনে অনুপস্থিত তথ্য হালনাগাদ, ওয়েবসাইটের উপজেলা তালিকা সংশোধন এবং সেবা প্রদানের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।


সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত, কোন কাজ কত দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে তা নির্ধারণ করে নাগরিকদের জানানো। পাশাপাশি অনলাইনে তথ্য পাওয়া না গেলে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, কী কী কাগজপত্র লাগবে এবং কত দিনে সেবা দেওয়া হবে—এসব তথ্য অফিসের নোটিশ বোর্ড ও অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশ করা প্রয়োজন।


জনগণের করের অর্থে পরিচালিত সরকারি দপ্তরের সেবা মানুষের কাছে সহজলভ্য হওয়াই প্রত্যাশিত। গেজেট প্রকাশ, ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং নাগরিকের হাতে সেই তথ্য পৌঁছে দেওয়া—এই তিনটি পর্যায়ের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে ডিজিটাল সেবার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।


খানসামার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট উপজেলা, জেলা ও অধিদপ্তর পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করবেন। অনলাইনে ভূমির তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা, বিকল যন্ত্রপাতি সচল করা এবং সেবাগ্রহীতাদের অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শুধু সমস্যার কথা জানা নয়, সমাধানের অগ্রগতি প্রকাশ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


প্রতিবেদকের নোট: প্রকাশের আগে খানসামার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা, দিনাজপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে অনলাইনে তথ্য না থাকার কারণ, বিকল যন্ত্রপাতি সচল করার পরিকল্পনা এবং কাজ শেষ করার সম্ভাব্য সময়সীমা তাঁদের কাছে জানতে চাইলে প্রতিবেদনটি আরও তথ্যসমৃদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক হবে।


আত্রাই বার্তা

সম্পাদক : মোঃ মোজাফফর হোসেন, বার্তা সম্পাদক শেখ নেছারুল ইসলাম
কপিরাইট © ২০২৬ আত্রাই বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত