পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি ধসে শিক্ষিকার মৃত্যু: এক মাস পর ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তর, অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
কালীগঞ্জ উপজেলার শিমুলিয়া এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি ধসে সহকারী শিক্ষিকা সারমিন ফেরদৌসী শিউলির মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার এক মাস পর তাঁর পরিবারের হাতে চার লাখ টাকার ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ঘটনায় আহত দুই ব্যক্তির পরিবারকেও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
সোমবার (৮ জুন) দুপুরে কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই চেক হস্তান্তর করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম কামরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও গাজীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এ কে এম ফজলুল হক মিলন।
অনুষ্ঠানে নিহত শিক্ষিকা সারমিন ফেরদৌসী শিউলির পরিবারের হাতে চার লাখ টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়। এছাড়া আহত তন্ময় (১৬) তিন লাখ টাকা এবং পূজা রানী দেবনাথ (২০) এক লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা পান।
উল্লেখ্য, গত ৫ মে বিকেলে টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কের শিমুলিয়া এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের একটি সাবস্টেশন-সংলগ্ন সিমেন্টের খুঁটি হঠাৎ ভেঙে সড়কের ওপর পড়ে যায়। খুঁটির সঙ্গে সংযুক্ত বৈদ্যুতিক তারের টানে পর্যায়ক্রমে আরও অন্তত ১৩টি খুঁটি ধসে পড়ে। মুহূর্তেই সড়কজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উচ্চ-ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তার।
এ সময় ঘটনাস্থল দিয়ে যাওয়া একটি অটোরিকশায় থাকা তুমুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সারমিন ফেরদৌসী শিউলি বিদ্যুতায়িত তারের সংস্পর্শে এসে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আহত হন বক্তারপুর এলাকার তন্ময় এবং তুমুলিয়া মিশন এলাকার পূজা রানী দেবনাথ।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নির্মাণগত ত্রুটির ফল। পল্লী বিদ্যুতের নিয়ম অনুযায়ী ৪৫ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি খুঁটি মাটির নিচে সাড়ে ছয় থেকে সাত ফুট গভীরে স্থাপন করার কথা থাকলেও শিমুলিয়া এলাকার খুঁটিগুলো মাত্র তিন থেকে চার ফুট গভীরে পোঁতা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া জলাশয়সংলগ্ন নরম মাটিতে খুঁটি স্থাপনের ক্ষেত্রে কংক্রিট মাফিং, অ্যাঙ্কর স্থাপন এবং পাথরকুচি দিয়ে র্যামিংসহ অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ বাধ্যতামূলক হলেও তা অনুসরণ করা হয়নি বলেও জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগে একই এলাকায় একসঙ্গে একাধিক বিদ্যুতের খুঁটি হেলে পড়ার ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটলেও কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব খালেকুজ্জামান বাবলু, বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, সুধীজন, পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা।
এদিকে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অনেক এলাকায় পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ খুঁটি এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। নিয়মিত জরিপ ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন মাটির নিচে (আন্ডারগ্রাউন্ড) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতিপূরণ প্রদান প্রশংসনীয় হলেও ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সবচেয়ে জরুরি।