ঐতিহ্যের রঙে, সাম্যের সুরে—খানসামায় বর্ণাঢ্য পহেলা বৈশাখ উদযাপন
দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপিত হয়েছে বাঙালির চিরচেনা ঐতিহ্য, রঙ ও আনন্দের আবহে। সকাল থেকেই উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা—লাল-সাদা পোশাকে সজ্জিত মানুষের ঢল, ঢোলের তালে তালে প্রাণের উচ্ছ্বাস, আর চারপাশজুড়ে এক আনন্দময় পরিবেশ।
দিনের সূচনা হয় বর্ণাঢ্য বৈশাখী র্যালির মাধ্যমে। র্যালিতে অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মুখোশ, ব্যানার ও নানা রঙের সাজে সজ্জিত এ র্যালি যেন হয়ে ওঠে বাঙালির সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
র্যালি শেষে আয়োজিত হয় পান্তা-ইলিশ ও ভাজি মাছের আপ্যায়ন, যা বাঙালির শেকড়ের সাথে গভীরভাবে জড়িত। একসাথে বসে এই ঐতিহ্যবাহী খাবার উপভোগের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য মিলনমেলা—সম্প্রীতি আর ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয় সকলেই।
অনুষ্ঠানের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্বে খানসামা থানার ইউএনও মোঃ কামরুজ্জামান সরকার তার বক্তব্যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা তুলে ধরেন। তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর ‘সাম্যবাদী’ কবিতা থেকে আবৃত্তি করেন—
“যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্লিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান!
কে তুমি?—পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
কন্ফুসিয়াস? চার্বাক-চেলা?—ব’লে যাও, বলো আরো!”
এই আবৃত্তির মধ্য দিয়ে তিনি সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের ঐক্যের আহ্বান জানান, যা উপস্থিত জনতার মাঝে গভীর অনুরণন সৃষ্টি করে।
এরপর শুরু হয় জমজমাট সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। লোকগান, নৃত্য ও আবৃত্তিতে মুখর হয়ে ওঠে মঞ্চ। ঢোল, তবলা আর বাঁশির সুরে যেন ফিরে আসে গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য। দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন একের পর এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলার এসিল্যান্ড ও রবিউল আলম তুহিনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ।
পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। নতুন বছরের আগমনে সবাই মিলে উচ্চারণ করেন—পুরনো সব গ্লানি মুছে যাক, নতুন বছরে আসুক সুখ, শান্তি আর সমৃদ্ধির বারতা।