প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬
রাত জাগা সংগ্রাম থেকে প্রযুক্তিখাতে—সুজন চন্দ্রের বদলে যাওয়ার গল্প
মো রিপন ইসলাম ||
দারিদ্র্য, অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও শেখার অদম্য ইচ্ছা মানুষকে বদলে দিতে পারে—তারই এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার তরুণ সুজন চন্দ্র। ছোটবেলায় সংসারের অভাব মেটাতে কখনো বাজারে, কখনো মানুষের বাড়িতে টুকিটাকি কাজ করেছেন তিনি। রাত কেটেছে কখনো ক্ষুধা নিয়ে, কখনো বাবা-মায়ের সংসার চালানোর দুশ্চিন্তার ফিসফিস কথায়। সেই বাস্তবতা আজও ভুলে যাননি সুজন। তবে অভাবকে নিজের ভবিষ্যতের শেষ পরিচয় হতে দেননি।সুজনের বাবা দিনমজুর এবং মা মানুষের বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ করেন। দুজনের সীমিত আয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটানোই ছিল কঠিন। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ছোটবেলা থেকেই নানা কাজ করতে হয়েছে সুজনকে। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার সেই অভিজ্ঞতা তাকে বাস্তব জীবনের কঠিনতা বুঝিয়েছে। কিন্তু প্রতিকূলতার মধ্যেও তার মনে ছিল নিজের জীবনকে দক্ষতা ও শিক্ষার মাধ্যমে বদলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা।সেই সুযোগ আসে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি), খানসামায়। ASSET প্রকল্পের আওতায় বিনামূল্যে ওয়েব ডিজাইন প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়ে সুজন আর পিছিয়ে থাকেননি। ভর্তি হন প্রশিক্ষণ কোর্সে। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে যেখানে অনেকের কাছে প্রশিক্ষণের খরচও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে বিনামূল্যের এই সুযোগ তার জন্য হয়ে ওঠে নতুন সম্ভাবনার দরজা।তবে প্রশিক্ষণের শুরুটা সহজ ছিল না। HTML-এর ট্যাগ, CSS-এর সিনট্যাক্সসহ ওয়েব ডিজাইনের বিভিন্ন বিষয় শুরুতে তার কাছে ছিল একেবারেই অপরিচিত। অনেক সময় কোড লিখেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যেত না। ভুল হতো, কাজ বন্ধ হয়ে যেত, আবার নতুন করে শুরু করতে হতো। কিন্তু ব্যর্থতাকে তিনি থামার কারণ হিসেবে নেননি।প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ক্লাস করার পাশাপাশি অবসর সময়ে কম্পিউটারে অনুশীলন করতেন সুজন। বাড়িতে ফিরে ইউটিউবের বিভিন্ন টিউটোরিয়াল ও বিনামূল্যের অনলাইন রিসোর্স ব্যবহার করে নিজের শেখার পরিধি বাড়াতে থাকেন। প্রতিদিনের ছোট ছোট অনুশীলন একসময় তাকে ওয়েব ডিজাইনের কাজে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর সুজন অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজ শুরু করেন। শুরুতে কাজ পাওয়া সহজ ছিল না। নতুন হিসেবে প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজের দক্ষতা তুলে ধরতে হয়েছে। ধৈর্য, নিয়মিত অনুশীলন এবং শেখার আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে তিনি কাজের সুযোগ পেতে শুরু করেন।সুজনের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত আসে প্রথম উপার্জনের টাকা হাতে পাওয়ার পর। সেই অর্থ নিজের জন্য খরচ না করে মায়ের হাতে তুলে দেন তিনি। মায়ের হাতে প্রথম উপার্জনের টাকা দেওয়ার মুহূর্তটি তার কাছে ছিল দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও পরিশ্রমের এক আবেগঘন স্বীকৃতি।বর্তমানে সুজন চন্দ্র টেক তরঙ্গ’-এ কর্মরত। প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা দিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন। যে তরুণ একসময় সংসারের অভাবের কারণে ছোটখাটো কাজ করতেন, প্রশিক্ষণ ও আত্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে আজ তিনি প্রযুক্তিখাতে নিজের পরিচয় তৈরি করার পথে রয়েছেন।সুজনের গল্প শুধু একজন তরুণের ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষার সম্ভাবনারও একটি বাস্তব চিত্র। বিশেষ করে প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারের তরুণদের জন্য বিনামূল্যে মানসম্মত প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি শেখার সুযোগ এবং প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কর্মসংস্থানের পথ তৈরি হলে তাদের জীবন বদলে যেতে পারে।বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, বর্তমান শ্রমবাজারে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, কর্মমুখী ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, প্রোগ্রামিংসহ বিভিন্ন ডিজিটাল দক্ষতা তরুণদের দেশীয় কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক কাজের সুযোগও তৈরি করে দিচ্ছে। সুজনের অভিজ্ঞতা সেই সম্ভাবনাকেই সামনে নিয়ে আসে।সুজনের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—অভাব মানুষের পথ কঠিন করতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন দেখার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। একটি উপযুক্ত প্রশিক্ষণের সুযোগ, একজন তরুণের আগ্রহ এবং নিজের ওপর বিশ্বাস—এই তিনের সমন্বয়েই বদলে যেতে পারে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ।সুজন চন্দ্রের ভাষায়, জীবনে সুযোগ পাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ; তবে সুযোগ পাওয়ার পর সেটিকে কাজে লাগানোর জন্য নিজের চেষ্টা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার পথচলা দেখিয়ে দেয়, সঠিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেলে প্রান্তিক পরিবারের তরুণরাও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল জগতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারেন।সুজনের গল্প তাই কেবল দারিদ্র্য থেকে উঠে আসার গল্প নয়। এটি একটি সুযোগ, একটি কম্পিউটার, কিছু রাত জাগা পরিশ্রম এবং হাল না ছাড়ার গল্প।খানসামা টিটিসি ও ASSET প্রকল্প তার সামনে যে দরজাটি খুলে দিয়েছিল, সুজন সেই দরজা দিয়ে শুধু নিজেই এগিয়ে যাননি—তার গল্প এখন অন্য তরুণদের জন্যও হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার একটি বার্তা।অভাব হয়তো সুজনের শৈশবের বাস্তবতা ছিল; কিন্তু দক্ষতা, পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাসই এখন তার ভবিষ্যতের পরিচয়।
সম্পাদক : মোঃ মোজাফফর হোসেন, বার্তা সম্পাদক শেখ নেছারুল ইসলাম
কপিরাইট © ২০২৬ আত্রাই বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত